October 22, 2026, 10:05 pm
শিরোনাম:

সড়ক নেই, কাঠের তৈরি সেতু ভাঙা, জোয়ার এলেই পানিবন্দী আশ্রয়ণের ৮০ পরিবার

Reporter Name

বরিশাল জেলা প্রতিনিধি।
সরকারি আশ্রয়ণের ঘর পেয়েও যেন বন্দিজীবন কাটছে ৮০ টি পরিবারের। আশ্রয়ণ প্রকল্পে যাতায়াতের স্থায়ী কোনো সড়ক নেই। জোয়ার এলেই চারপাশ পানিতে ডুবে যায়। ঘর থেকে বের হতে কখনো হাঁটতে হয় পানির মধ্য দিয়ে, আবার কখনো অন্যের জমি ও বাড়ির ওপর দিয়ে।

প্রায় চার বছর আগে যাতায়াতের জন্য তৈরি করা হয়েছিল একটি কাঠের সেতু। সেটিও দুই বছরের মধ্যে ভেঙে পড়ে। এরপর দুই বছরের বেশি সময় ধরে দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন বরিশালের বাবুগঞ্জ উপজেলার দ্বারিকা এলাকার আশ্রয়ণের ৮০ টি পরিবারের বাসিন্দারা।

সরেজমিনে দেখা যায়, সুগন্ধা নদীর তীরে পাশাপাশি দুটি আশ্রয়ণ প্রকল্পে ৮০টি ঘর রয়েছে। বাসিন্দাদের বের হওয়ার জন্য নেই নির্দিষ্ট সড়ক। একটি ইটভাটার ভেতর দিয়ে বের হওয়ার পথ থাকলেও গেট বন্ধ থাকায় পানি মাড়িয়ে চলাচল করতে হয় তাদের। অন্যদিকে, ছোট একটি খাল পার হয়ে স্থানীয় কয়েকটি বাড়ির ভেতর দিয়ে বের হওয়ার সুযোগ থাকলেও সেখানেও নানা বিড়ম্বনার মুখে পড়তে হয়।

আশ্রয়ণের বাসিন্দা ৫০ বছর বয়সী মো.ইলিয়াস মাছ ধরার চাই তৈরি করে জীবিকা নির্বাহ করেন। সরকারি বরাদ্দ পাওয়া ঘরের সামনে বসে বাঁশের কঞ্চি দিয়ে চাই বুনতে বুনতে তিনি শোনালেন তাদের দুর্ভোগের কথা।

রফিকুল ইসলাম বলেন, একসময় মোগো জমি-জায়গা, ঘরবাড়ি-সবই আছিল। নদীভাঙনে হেইসব কিছু হারাইছি। চাইর বছর আগে সুগন্ধা নদীর পারে দ্বারিকা আশ্রয়ণে দুই শতক জাগা আর একখান ঘর পাইছি। কিন্তু চলাচলের কোনো রাস্তা নাই। জোয়ার আইলেই চারপাশ পানিতে ডুইবা যায়।

তিনি বলেন, চার বছর আগে যাতায়াতের লাইগ্যা একখান কাঠের পুল বানাইয়া দিছিল। কিন্তু দুই বছরের মধ্যেই হেইডা ভাইঙ্গা গেছে। হেইরপর থেইকা প্রায় দুই বছর ধইরা মোগো খুব কষ্ট কইরা চলাফেরা করতে হয়। পানির মইধ্যে দিয়া, মানুষের জমির ওপর দিয়া চলাফেরা করি। জোয়ার আইলে কষ্ট আরও বাড়ে। ঘর থেইক্যা বাইর হইতে গেলেও অনেক ঝামেলা পোহাইতে হয়। নদী সব কাইড়া নিছে। এহন আশ্রয়ণের ঘর পাইছি ঠিকই, কিন্তু রাস্তা না থাকায় এহনও কপালে সুখ নাই।

শুধু রফিকুল নন, একই দুর্ভোগের কথা জানিয়েছেন আশ্রয়ণের অন্য বাসিন্দারাও।

আশ্রায়নের বাসিন্দারা জানান , প্রায় ৮০ জন শিক্ষার্থী প্রতিদিন খালের পানি মাড়িয়ে স্কুলে যাতায়াত করে।
আশ্রয়ণে বেড়ে ওঠা বাবুগঞ্জ সরকারি পাইলট মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী রবিউল ইসলাম বলেন, আমাদের এখান থেকে বের হওয়ার জায়গা নেই। একটা কাঠের পুল ছিল, সেটাও নষ্ট হয়ে গেছে। স্কুলে যেতে হলে মূল সড়কে ওঠার আগে পানির মধ্য দিয়ে যেতে হয়। অনেক সময় জামা-কাপড় হাতে নিয়ে যেতে হয়। আমরা সরকারের কাছে একটি রাস্তার জন্য আবেদন করছি।

আশ্রয়ণের বাসিন্দা সেফালি বেগম বলেন, আমরা অসুস্থ হলে কোলে করে রাস্তায় নিতে হয়। একটা ভ্যান নিয়েও হাসপাতালে যাওয়ার অবস্থা নেই। কিছুদিন আগে আমি অসুস্থ হলে চার-পাঁচজন মিলে ধরে ডাক্তারের কাছে নিয়ে গেছে।

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, জোয়ারের পানি বাড়লে আশ্রয়ণ প্রকল্পের চারপাশ ডুবে যায়। এতে শিশু, শিক্ষার্থী, নারী ও বয়স্কদের দুর্ভোগ সবচেয়ে বেশি হয়। জরুরি প্রয়োজনে রোগী নিয়ে বের হওয়াও কঠিন হয়ে পড়ে।

জানা গেছে, ভূমিহীন ও গৃহহীন পরিবারের পুনর্বাসনের জন্য আশ্রয়ণ প্রকল্প-২-এর আওতায় ২০২১ সালে বাবুগঞ্জ উপজেলার দ্বারিকা এলাকায় ৮০টি পরিবারকে দুই শতাংশ করে জমি ও ঘর দেওয়া হয়। সরকারি অর্থায়নে নির্মিত এসব ঘর সুগন্ধা নদীর তীরে দুটি আশ্রয়ণ প্রকল্পে স্থাপন করা হয়েছে।

তবে ঘর নির্মাণের পর বাসিন্দাদের যাতায়াতের জন্য স্থায়ী সড়ক না থাকায় তৎকালীন উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে প্রায় ২০০ ফুট দীর্ঘ একটি কাঠের সেতু নির্মাণ করা হয়। কয়েক বছরের মধ্যেই সেটি নষ্ট হয়ে যাওয়ার পর নতুন করে স্থায়ী যাতায়াতব্যবস্থা তৈরি হয়নি বলে জানিয়েছেন বাসিন্দারা।

আশ্রয়ণের ঘর ও জমি পাওয়ার পরও রাস্তার অভাবে স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারছেন না তারা। বিশেষ করে বর্ষা ও জোয়ারের সময় দুর্ভোগ চরমে ওঠে। তাই আশ্রয়ণ প্রকল্পের ৮০ পরিবারের জন্য দ্রুত একটি স্থায়ী সড়ক নির্মাণের দাবি জানিয়েছেন তারা।

স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের প্যানেল চেয়ারম্যান সুমন সিকদার বলেন, রাস্তা না থাকায় আশ্রায়নের বাসিন্দারা কষ্টে যাতায়াত করছে বলে জানতে পেরেছি। আমি বিষয়টি ইউএনও স্যারকে অবহিত করবো ও সরজমিন পরিদর্শন করে যথাসম্ভব যাতায়াতের ব্যবস্থা করবো।

উপজেলা নির্বাহী অফিসার আসমা উল হুসনা বলেন, বিষয়টি আমি আপনাদের কাছ থেকেই অবহিত হলাম। আশ্রায়নের ৮০ টি পরিবারের জন্য কেন রাস্তা করা হয়নি সে বিষয়টি সরেজমিনে গিয়ে প্রত্যক্ষ করবো এবং উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা গ্রহন করা হবে।