বাকেরগঞ্জ (বরিশাল) প্রতিনিধি৷ নানা কর্মসূচির মধ্য দিয়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে ‘জুলাই শহীদ দিবস’ পালিত হলেও বরিশালের বাকেরগঞ্জে দায়সারাভাবে পালিত হয়েছে জুলাই শহীদ দিবস। রাষ্ট্রীয়ভাবে দিবসটি পালনের জন্য যথাযথ নির্দেশ দিলেও বাকেরগঞ্জ উপজেলা প্রশাসনের ক্ষেত্রে সেটি ছিল উপেক্ষিত।
গত ১৬ জুলাই বৃহস্পতিবার সকাল ১১ টায় বাকেরগঞ্জে উপজেলা প্রশাসনের আয়োজনে উপজেলা পরিষদ হলরুমে দিবসটি পালন উপলক্ষে নামেমাত্র আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়।
বাকেরগঞ্জ উপজেলা প্রশাসনের আয়োজিত জুলাই শহীদ দিবসের জুলাই যোদ্ধাদের আমন্ত্রন না করায় জুলাই আন্দোলনের নেতৃত্ব দেয়া শাবনুর আকন, আমানতুর রহমান সুমি, সফিকুর রহমান অভি, তৌসিফ বিশ্বাস, ভাবনা আফরোজ ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, উপজেলা প্রশাসনের এমন উদাসীনতা শুধু দুঃখজনক বিষয় নয় এটা তাদের বড় ধরনের দায়িত্বহীনতা বলেও তারা মন্তব্য করেছেন।
জুলাই যোদ্ধা সাইফুল জানান, আগষ্টের ১ তারিখ শাবনুর আকনের মেসেঞ্জার গ্রুপ পোষ্ট এবং ফোন কলের মাধ্যমে আন্দোলনে যোগ দেয়ার কথা বলেন এবং আমরা অনেকেই তার নেতৃত্বে আন্দোলনে অংশগ্রহন করি। আর আগে আমরা শাবনুর আপুর সাথে বরিশাল ববি এবং বিএম কলেজে আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা রাখি। কিন্তু যখন ১৪৪ ধারা জারি হয় এবং যাতায়াত পথ বন্ধ হয়ে যায় তখন আমরা বাকেরগঞ্জ আন্দোলন করার কথা ভাবি। নুসরাত জাহান জ্যোতি আপু সহ দিথি, নাভিল ভাই, ইশান সহ অনেকেই সক্রিয় ভূমিকা পালন করে। জ্যোতি আপু চেয়েছিল সেদিন দেয়াল লিখন করতে কিন্তু বৃষ্টি থাকার কারনে সম্ভব হয় নি। এরপর শাবনুর আপুর সাথে আন্দোলনে যোগ দেন। সেদিন শাবনুর আপু তার লাল ওড়না থেকে কাপড় কেটে আমাদের সবার মাথায় বেঁধে দেন।
সাইফুল ইসলাম আরো বলেন, সেদিন শাবনুর আপু আওয়ামীলীগ গুন্ডাবাহিনী এবং পুলিশ বাহিনীর সাথে বাকবিতণ্ডায় জড়িয়ে পড়ার কারনে রাত্রে আওয়ামীলীগের গুন্ডা বাহিনী তার বাসা ঘেরাও করে এবং ডিবি পুলিশের হয়রানির স্বীকার হয়ে দুই বাচ্চা নিয়ে পালাতে যেয়ে তার পা পিছলে পড়ে গিয়ে আহত হন। যারা আন্দোলনে যোগ দিয়েছিল সবাই পালিয়ে নিজের জীবন রক্ষা করেছে। কিন্তু তাদের নূন্যতম সম্মান টুকুও বাকেরগঞ্জ উপজেলা প্রশাসন দেয় নি। আমরা দেশের জন্য লড়েছি প্রয়োজনে আরও লড়ব। কোনো ধরনের আর্থিক সহায়তা আমরা চাই না। যা চাই তা হচ্ছে নূন্যতম সম্মান। যে দেশে গুনীর কদর করা হয় না, সেদেশে গুনী জন্মায় না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
জুলাই শহীদ ওয়াদুদ ও রাসেল তালুকদারের পরিবার জানায়, বৃহস্পতিবার জুলাই শহীদ দিবস উপলক্ষে উপজেলা প্রশাসন আয়োজিত অনুষ্ঠান সম্পর্কে তারা অবগত নয়। জুলাইতে নিহত উপজেলার ৬ জন শহীদের কারো কবর জিয়ারততো দূরের কথা উপজেলা প্রশাসনের পক্ষে কেউ তাদেরকে ফোন দিয়ে খোঁজ নেয়নি। শুধুমাত্র হোয়াটসআপ গ্রুপে ইউএনও’র অফিস সহকারী শহিদুল ইসলাম একটি মেসেজ দিয়েছেন।
জুলাই শহীদদের আত্মার মাগফিরাত কামনায় দেশের সব মসজিদে বিশেষ দোয়া ও অন্যান্য ধর্মীয় উপাসনালয়ে বিশেষ প্রার্থনার আয়োজন করার কথা থাকলেও বাকেরগঞ্জের কোথাও কোন দোয়া-মোনাজাত হয়নি ।
সুত্র জানায়, বিগত ২০২৪ সালের ১৬ জুলাই সরকারি চাকরিতে বৈষম্যমূলক কোটাব্যবস্থা বিলোপের দাবিতে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর পুলিশের গুলিতে শহীদ হন রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থী আবু সাঈদ। একই দিনে ঢাকা ও চট্টগ্রামে শহীদ হন আরো পাঁচজন। চলতি বছরের ২ জুলাই এক পরিপত্রে প্রতিবছর ১৬ জুলাই ‘জুলাই শহীদ দিবস’ পালনের ঘোষণা দেয় অন্তর্বর্তী সরকার।
বাকেরগঞ্জ প্রেসক্লাব সাধারণ সম্পাদক ইমরান খান সালাম জানান, অনুষ্ঠান সম্পর্কে উপজেলায় কর্মরত পেশাদার সাংবাদিকরাও অবগত নয়। কোন রকমে সাদামাটাভাবে আলোচনা সভার মধ্য দিয়ে শেষ করেছে জুলাই শহিদ দিবসের অনুষ্ঠান।
বাংলাদেশ মফস্বল সাংবাদিক ফোরাম বিএমএসএফ বাকেরগঞ্জ উপজেলা শাখার সভাপতি জিয়াউল হক আকন বলেন, শুধু শহীদ জুলাই দিবসই নয় রাষ্ট্রীয় অন্যান্য দিবসেও উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে পেশাদার সাংবাদিকদের অবগত করে না উপজেলা প্রশাসন। উপজেলা প্রশাসনের এমন উদাসীনতা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মিল্টন চন্দ্র পাল এর দায়িত্বহীনতা বলেও মনে করেন সাংবাদিক সমাজ।
বরিশাল মহানগর ছাত্রদলের যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক তাহমিদ আহমেদ জানান, বুধবার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ের অফিস সহকারী শহিদুল ইসলাম তাকে মোবাইল ফোনে জুলাই শহীদ দিবসের অনুষ্ঠানের দাওয়াত দিয়েছেন। এবং এ বিষয়ে হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে তাকে একটি মেসেজ দিতে বলেন। প্রথমবারের মতো জাতীয়ভাবে জুলাই শহীদ দিবস পালন করলেও বাকেরগঞ্জে উপজেলা প্রশাসনের দায়সারা অনুষ্ঠান আয়োজন নিয়ে তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করেন।
জুলাই শহীদ দিবসের অনুষ্ঠানে নিহতের পরিবারের কেউ উপস্থিত ছিলনা কেন এ বিষয়ে জানতে চাইলে উপজেলা নির্বাহী অফিসার মিলটন চন্দ্র পাল বলেন, জুলাই শহীদ দিবসের অনুষ্ঠানে নিহত ও গেজেটভূক্ত সকলকে দাওয়াত দেয়া হয়েছিল। দায়সারা অনুষ্ঠান আয়োজনের বিষয় জানতে চাইলে তিনি ছাত্রদল নেতা তাহমিদের সাথে কথা বলতে বলেন।
যাদের রক্তের ওপর দিয়ে আজ গণতান্ত্রিক সরকার রাষ্ট্র ক্ষমতায় সেই জুলাই শহীদ দিবসের অনুষ্ঠানে উপজেলা প্রশাসনের দায়সারা আয়োজন নিয়ে নিহত ও আহত পরিবারের মাঝে চরম ক্ষোভ বিরাজ করছে। তাদের এ ক্ষোভ যে কোন সময় বিক্ষোভে রুপ নিতে পারে।