জিয়াউল হক, বরিশাল।।
বরিশালের বাকেরগঞ্জ উপজেলার কলসকাঠী ইউনিয়নে পান্ডব নদীর অব্যাহত ভাঙনে একের পর এক বিলীন হচ্ছে জনপদ। নদীগর্ভে হারিয়ে যাচ্ছে পাকা সড়ক, বসতবাড়ি, মসজিদ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ফসলি জমি ও পারিবারিক কবরস্থান। কয়েক বছর আগে নদীর বুকে হারিয়ে গেছে আমিনপুর নামে একটি পুরো গ্রাম। এবার অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে দক্ষিণ সাদিস গ্রাম। প্রতিদিন নদীর পাড় ভেঙে নতুন নতুন এলাকা বিলীন হওয়ায় চরম আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন নদীপাড়ের বাসিন্দারা।
সরেজমিনে দেখা যায়, দক্ষিণ সাদিস গ্রামের অর্ধেকেরও বেশি অংশ ইতোমধ্যে পান্ডব নদীর গর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। একসময়ের জনবহুল এলাকাজুড়ে এখন নদীর উত্তাল স্রোত আর ভাঙনের ক্ষতচিহ্ন। ভাঙনের কবলে পড়ে বিলীন হয়েছে সাদিস ফকির বাড়ি জামে মসজিদ ও দক্ষিণ সাদিস মাদ্রাসা। এর আগে নদীগর্ভে হারিয়ে গেছে দক্ষিণ সাদিস সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। বসতভিটা ও ফসলি জমি হারিয়ে নিঃস্ব হয়েছেন অনেক পরিবার।
ভাঙনের শিকার অনেক পরিবার নিজেদের শেষ সম্বল নিয়ে আশ্রয় নিয়েছিলেন সাদিস গ্রামের সড়কের পাশে। কিন্তু এবার সেই সড়কটিও নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। গত ২৫ অক্টোবর রাত ১০টার দিকে সাদিস আমতলী খেয়াঘাটসংলগ্ন সড়কে ভাঙন শুরু হয়। পরবর্তী দুই দিনের মধ্যে সড়কটির পুরো অংশ নদীতে বিলীন হয়ে যায় বলে স্থানীয়রা জানান। এতে খেয়াঘাটসংলগ্ন সড়কে যানবাহন চলাচল বন্ধ হয়ে পড়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন স্থানীয় ব্যবসায়ীরাও। দোকানপাট হারিয়ে অনেকেই এখন দিশেহারা।
এদিকে সাদিস আমতলী খেয়াঘাটসংলগ্ন শত শত বসতবাড়ি নতুন করে ভাঙনের ঝুঁকিতে রয়েছে। ঘরবাড়ি হারানোর আশঙ্কায় উদ্বেগ-উৎকণ্ঠায় দিন কাটাচ্ছেন নদীপাড়ের বাসিন্দারা। যাঁরা একবার ভিটেমাটি হারিয়ে অন্যত্র আশ্রয় নিয়েছিলেন, তাঁরাও এখন নতুন করে বাস্তুচ্যুত হওয়ার ভয়ে রয়েছেন। তাঁদের প্রশ্ন শেষ আশ্রয়টুকুও নদীতে বিলীন হলে কোথায় গিয়ে দাঁড়াবেন তাঁরা?
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, নদীর ভাঙন এখন তাঁদের নিত্যদিনের আতঙ্ক। প্রতিদিনই নদীর পাড় ধসে পড়ছে। অনেক পরিবারকে রাতের আঁধারে ঘরবাড়ি সরিয়ে নিতে হয়েছে। কেউ হারিয়েছেন কৃষিজমি, কেউ ফলের বাগান, আবার কেউ হারিয়েছেন পৈতৃক ভিটা। জীবিকার প্রধান অবলম্বন কৃষিজমি নদীতে বিলীন হওয়ায় অসংখ্য কৃষক আর্থিক সংকটে পড়েছেন।
নদীভাঙনের কারণে শুধু বসতবাড়ি কিংবা জমিজমা নয়, এলাকার যোগাযোগব্যবস্থা, শিক্ষা ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। দীর্ঘদিনের বসতভিটা, পারিবারিক স্মৃতি এবং পূর্বপুরুষের কবরস্থান হারিয়ে মানসিকভাবেও ভেঙে পড়েছেন অনেকে।
গ্রামবাসীর অভিযোগ, বছরের পর বছর ধরে নদীভাঙন রোধে স্থায়ী বাঁধ নির্মাণ ও কার্যকর নদীশাসনের দাবি জানানো হলেও দৃশ্যমান কোনো স্থায়ী উদ্যোগ তাঁরা দেখেননি। ফলে প্রতিবছর নতুন নতুন এলাকা নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে। আমিনপুর গ্রাম হারিয়ে যাওয়ার পরও কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়ায় এবার দক্ষিণ সাদিসের অস্তিত্ব হুমকির মুখে পড়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দা আবু সালে বলেন, “আমিনপুর গ্রাম এখন শুধু স্মৃতি। আমাদের চোখের সামনে পুরো একটি গ্রাম নদীতে হারিয়ে গেছে। শত শত পরিবার নিঃস্ব হয়েছে। তারপরও স্থায়ী কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। এখন দক্ষিণ সাদিসও একই পরিণতির দিকে এগোচ্ছে। দ্রুত পদক্ষেপ না নিলে এই গ্রামটিও মানচিত্র থেকে মুছে যাবে।
এলাকাবাসীর দাবি, সাময়িকভাবে বালুর বস্তা ফেলে দায়সারা ব্যবস্থা না নিয়ে দ্রুত টেকসই নদী রক্ষা বাঁধ নির্মাণ করতে হবে। পাশাপাশি আধুনিক নদীশাসন প্রকল্প বাস্তবায়ন ও ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করতে হবে। অন্যথায় পান্ডব নদীর ভাঙনে দক্ষিণ সাদিসসহ আশপাশের আরও বিস্তীর্ণ এলাকা বিলীন হওয়ার আশঙ্কা করছেন তাঁরা।
এ বিষয়ে বরিশাল পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী জাবেদ ইকবাল বলেন, দক্ষিণ সাদিস গ্রামে পান্ডব নদীর ভাঙনের বিষয়টি তাঁদের নজরে এসেছে। সাদিস খেয়াঘাটসংলগ্ন সড়কটি নদীতে বিলীন হওয়ার খবর পেয়ে প্রকৌশলীদের একটি দল ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে। ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ মূল্যায়নের ভিত্তিতে নদীভাঙন রোধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
পান্ডব নদীর অব্যাহত ভাঙন এখন দক্ষিণ সাদিসের মানুষের জন্য বড় ধরনের মানবিক ও অর্থনৈতিক সংকটে পরিণত হয়েছে। স্থানীয়দের প্রত্যাশা, আমিনপুরের মতো আর কোনো জনপদ যেন মানচিত্র থেকে হারিয়ে না যায়, সে জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেবে।